কর্পোরেট পর্যায় মিষ্টির ব্যবসা!

বাংলাদেশে মিষ্টির ব্যবসা একসময় ঘোষদের দখলে থাকলেও এখন অবস্থা বদলেছে৷ বড় বিনিয়োগ নিয়ে মিষ্টির চেনশপ চালু হয়েছে ঢাকায়৷ তারা ব্র্যান্ডিং-এর ওপর জোর দিচ্ছেন৷ তবে ক্রেতাদের মধ্যে দাম নিয়ে আছে আপত্তি৷ বাংলাদেশে একাধিক আউটলেট খুলে, আধুনিক প্যাকেটে, রীতিমত বিজ্ঞাপন দিয়ে মিষ্টির ব্যবসা শুরু করে আলাউদ্দিন সুইটমিট৷

১৯৮৩ সালে পুরান হাজি মাসুম উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া মিষ্টির ব্যবসাকে আধুনিক কর্পোরেট ব্যবসায় রূপ দেন৷ তিনি আলাউদ্দিন সুইটমিটকে লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত করেন৷ শুধু বাংলাদেশে নয় নিউইয়র্ক, লন্ডনে শাখা খোলেন৷ এরপর সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এবং ভারতেও মিষ্টির ব্যবসা শুরু করে আলাউদ্দিন সুইটমিট৷

প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের পূর্বপুরুষ আলাউদ্দিন ভারতের লক্ষ্ণৌর বাসিন্দা ছিলেন৷ সেখান থেকেই তাঁর মিষ্টি ব্যবসা শুরু৷ তিনি পরে বাংলাদেশ এসে চকবাজারে মিষ্টির ব্যবসা শুরু করেন৷ এখন ঢাকাসহ বড় বড় শহরে শাখা আছে৷ ৫০ ধরনের মিষ্টি তৈরি করে তারা৷

ব্র্যান্ডের মিষ্টি: ঢাকায় এখন মিষ্টির আরও কয়েকটি ব্র্যান্ড আছে৷ এর মধ্যে অন্যতম হলো মিনা সুইটস, প্রিমিয়াম সুইটস, প্রমিনেন্ট সুইট রস, বনফুল, মিঠাই, জয়পুর, মুসলিম সুইটস ইত্যাদি৷ তারা মিষ্টির প্রচলিত ব্যবসাকে পেছনে ফেলে ব্র্যান্ডিং-এ এগিয়ে যাচ্ছে৷ ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে বছরে ২০ হাজার কোটি টাকার মিষ্টির ব্যবসা হয়৷ যারা বড় বিনিয়োগ নিয়ে এই ব্যবসায় নেমেছে তারা রীতিমত মার্কেট স্টাডি করে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে৷

অনেকেরই এখন শাখা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ক্যানাডাসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে৷ প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশীয় মিষ্টি খেতে চান৷ তাদের চাহিদার দিকে লক্ষ্য রেখে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বিদেশে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে৷ আর এই ব্যবসা সম্প্রসারণে মিষ্টি রপ্তানি নয়, ঐ সব দেশে সরাসরি মিষ্টির কারখানা খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে৷

বাংলাদেশে মোট যে পরিমাণ মিষ্টি বিক্রি হয় তার শতকরা ৫০ ভাগই রসগোল্লা বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা৷ তারা জানান, ‘‘নানা নামে মিষ্টির হরেক রকম আইটেম আসলেও রসগোল্লার দাপট এখনো কমেনি৷ রসগোল্লাকেই আবার নানাভাবে নতুন নামে ব্র্যান্ডিং করছেন কেউ কেউ৷

এখন যারা মিষ্টির কর্পোরেট ব্যবসা করেন তারা ব্যবসা প্রতষ্ঠানের নামের ব্র্যান্ডিং যেমন চান, তেমনি তারা তাদের নিজস্ব প্রোডাক্ট হিসেবে বিভিন্ন ধরণের মিষ্টির ব্র্যান্ডিংও করছেন৷ সে কারণে সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের হালুয়া বাজারজাত করা হচ্ছে, সেগুলো জনপ্রিয়ও হচ্ছে৷

প্যাকেজিং: যারা বড় আকারে কর্পোরেট মিষ্টির ব্যবসা করছেন তারা প্যাকেজিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন৷ উৎসব আয়োজনে বাহারি মিষ্টির প্যাকেট মন ভুলিয়ে দেয়, থাকে বিশেষ অফার৷ কোনো কোনো মিষ্টির দোকান এখন গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী প্যাকেট করে দেন৷ আর এই প্যাকেজিং-এ এখন বাঁশ বেতের ব্যবহারও হচ্ছে৷

মিষ্টির প্যাকেজিং এখন ছোট হলেও আলাদা শিল্প হিসেবে গড়ে উঠছে৷ এই প্যাকেজিং-এ ঐতিহ্যবাহী মাটির হাড়ি ফিরে এসেছে, তবে তা ভিন্ন রূপে৷ রস মিষ্টির উপ-মহাব্যবস্থাপক এম কে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আগে দর্শনধারী, পরে গুণবিচারী৷ আমরা গ্রাহকদের কাছে সুদৃশ্য মোড়কে মিষ্টি তুলে দেই৷ এছাড়া আমরা মানও বজায় রাখি৷ ফলে আমাদের উপস্থাপনা যেমন সুন্দর, তেমনি পণ্যও মানসম্পন্ন হয়৷ তাই আমাদের মিষ্টির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে৷”

পোড়াবাড়ির চমচম: টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমকে বলা হয় মিষ্টির রাজা৷ যমুনার শাখা নদী ধলেশ্বরীর তীরের গ্রাম পোড়াবাড়িতে প্রথম এই মিষ্টি তৈরি শুরু হয়৷ এখানকার নদীর পানি নাকি সেই মিষ্টির স্বাদে আলাদা একটা বিশেষত্ব যোগ করত৷ প্রায় দেড়শ বছর আগে ভারতের উত্তর প্রদেশের বালিয়া জেলার জনৈক রাজা রাম গোরার হাতে জন্ম হয় সুস্বাদু এই চমচমের৷

একই বক্তব্য মিনা সুইটস-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ আহমেদ এরও৷ তিনি বলেন, ‘‘এখন যুগটা হচ্ছে ব্র্যান্ডিং-এর যুগ৷ তাই মানের সঙ্গে প্যাকেজিং গুরুত্ব পাচ্ছে৷ যেমন পহেলা বৈশাখে এক ধরনের প্যাকেজিং লুক চান ক্রেতারা৷ আবার উৎসব অনুষ্ঠানে ক্রেতারা তাদের পছন্দ মত প্যাকেজিং চান৷ এখন মিষ্টি শুধু খাওয়ারই না, দেখারও৷”

মান নিয়ন্ত্রণ: রস মিষ্টির নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা কাঁচামাল থেকে শুরু করে উৎপাদন, বাজারজতকরণ প্রতিটি পর্যায়েই কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করি৷ মিষ্টির প্রধান কাঁচামাল দুধ, চিনি ও ময়দা৷ আমরা মান পরীক্ষার মাধ্যমেই এগুলো গ্রহণ করি৷ উৎপাদন এবং সংরক্ষণে আমাদের দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত লোক আছে৷ আর প্রচলিত কারিগরদের নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে কারিগর তৈরি করি৷ আমাদের পণ্য বিএসটিআই অনুমোদিত৷”

মিনা সুইটস-এর সাঈদ আহমেদও বলছেন, ‘‘আমাদের আধুনিক ফ্যাক্টরি আছে৷ আউটলেটগুলোও স্বাস্থ্যসম্মত৷ ফ্যাক্টরি থেকে আউটলেটে মিষ্টি পরিবহণে আমরা নিজস্ব পরিবহণ ব্যবহার করি৷ মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের কেমিস্ট আছেন৷ মিষ্টি উৎপাদনের আগে কাঁচামাল পরীক্ষা করা হয়৷ উৎপাদনের পরেও গুনাগুন পরীক্ষা করা হয়৷”

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা দেশে প্রায় এক হাজার মিষ্টির দোকান বা আউটলেট রয়েছে, যা প্রতিষ্ঠিত কর্পোরেট মিষ্টি ব্যবসায়ীদের দ্বারা পরিচালিত৷ ঢাকায় রয়েছে পাঁচ শতাধিক আউটলেট৷ এইসব শোরুমে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মিষ্টি বিক্রি হয়৷ তবে সবাই যে মিষ্টি তৈরি করেন তা নয়৷ মিষ্টি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২০০৷ মিষ্টির অন্যতম প্রধান উপাদান দুধ৷ বর্তমানে প্রায় তিন হাজার দুগ্ধ সরবরাহকারী আছেন৷

মিনা সুইটস-এর সাঈদ আহমেদ জানান, ‘‘আমরা মার্কেট স্টাডি করে দেখেছি বাংলাদেশে মিষ্টির বাজার অনেক বড়৷ এখানে উৎসব আয়োজনসহ নানা অনুষ্ঠানে মিষ্টির প্রচলন আছে৷ আর সাধারণভাবে মিষ্টি খায় এ দেশের মানুষ৷ বিদেশেও বাংলাদেশের মিষ্টির চাহিদা রয়েছে৷ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিদেশেও তাদের আউটলেট খুলেছে৷ আমরা এখন বাংলাদেশের মার্কেটকে আরো সংহত করার কাজ করছি৷ এরপর দেশের বাইরে রপ্তানির চিন্তা আছে৷”

তিনি জানান,‘মিষ্টির কারিগর হিসেবে দেশের ছাড়াও কলকাতার কিছু কারিগর এখানে কাজ করেন৷ আবার দেশের কারিগরদের দেশের বাইরে থেকে প্রশিক্ষণ দিয়েও আনা হয়৷ মিষ্টির নতুন আইটেম যোগ করা হয়৷ আর এজন্য গবেষণাও হয়৷’দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মিষ্টির দোকান আছে হাজার হাজার৷ গ্রামাঞ্চলে যেখানে দোকান সেখানেই মিষ্টি তৈরি হয়৷

বাংলাদেশে অঞ্চলভিত্তিক কিছু জনপ্রিয় মিষ্টি আছে৷ যেমন কুমিল্লার রসমালাই, টাঙ্গাইলের চমচম, যশোরের জামতলার রসগোল্লা, নওগাঁর প্যারা সন্দেশ, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, মুক্তাগাছার মণ্ডা, নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি ইত্যাদি৷ আর রসগোল্লার কপিরাইট কলকাতার হলেও বাংলাদেশের রসগোল্লাও বিখ্যাত৷

এইসব মিষ্টির জনপ্রিয়তা বিপুল৷ তবে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি এসব মিষ্টি বিক্রি করছেনা৷ রস মিষ্টির এম কে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘আমরা ঐসব মিষ্টি সরেজমিন গিয়ে দেখেছি৷ কারিগরদের সঙ্গে কথা বলেছি৷ তারপর নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি করেছি৷”

বাংলাদেশে ছোট মিষ্টির দোকান চালিয়ে পরে মিষ্টির কর্পোরেট ব্যবসায় গড়ে তুলেছে এমন প্রতিষ্ঠানও আছে৷ চট্টগ্রামের বনফুল এন্ড কোং সেরকমই একটি প্রতিষ্ঠান৷ তাদের ব্যবসা এখন ঢাকা ও সিলেটেও বিস্তৃত৷ দুবাই এবং লন্ডনে আছে আউটলেট৷

বনফুল-এর মালিক এম এ মোতালেব বলেন, ‘‘আশির দশকে আমি দেশের বাইরে গিয়ে মিষ্টির কর্পোরেট মার্কেটিং সম্পর্কে ধারণা পাই৷ তারপর ব্যবসার ধরন বদলে ফেলি৷ এরপর আরো অনেকে আমাকে ফলো করে৷ আমি নিজেই মিষ্টি তৈরিতে দক্ষ৷ আমি নিজে ভারত থেকে যেমন নানা ধরনের মিষ্টি তেরি শিখেছি, তেমনি ভারত থেকে কারিগর এনে আমার কারিগরদের শিখিয়েছি৷”

দামে অসন্তুষ্টি: মিষ্টির দাম নিয়ে অষন্তোষ আছে ক্রেতাদের মধ্যে৷ তাদের কথা, ‘‘এক কেজি রসগোল্লার দাম দোকানভেদে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা৷ এত পার্থক্য কেন হবে?” এ ব্যাপারে মিনা সুইটস-এর সাঈদ আহমেদ বলেন, ‘‘আমরা মানের সঙ্গে আপোষ করিনা৷ তারপরও আমাদের দাম রিজোনেবল৷ আমরা গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই দাম রাখি৷”

রস মিষ্টির এম কে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘‘পণ্যের মানের ওপর দাম নির্ভর করে৷ তাই দেখা যায় আমাদের দাম একটু বেশি হলেও ক্রেতা কিন্তু বাড়ছে৷” ঢাকা কেন্দ্রিক এই ব্র্যান্ড মিষ্টির প্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েকটি দুধের জন্য নিজস্ব ডেইরিও স্থাপন করেছে৷ তারা মিষ্টি উৎপাদনে নিজস্ব ডেইরির দুধ ব্যবহার করে৷

তথ্যসূত্র: ডয়চেভেল।

শেয়ার করুন:

Facebook
Twitter
Pinterest
LinkedIn

সম্পর্কিত পোস্ট

দেড়শ নারীকে স্বাবলম্বী করছেন ফেরদৌসি পারভীন!

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারীদের একটা অংশ উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু পুঁজির অভাবে অনেকেই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারছে না। থামি. পিননসহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পোশাক প্রস্তুত করতে

উদ্যোক্তাদের জন্য মানসিক চাপ কমানোর কিছু পন্থা

আমরা আজকে উদ্যোক্তাদের জন্য আলোচনা করবো মানসিক চাপ কমানোর পন্থা নিয়ে কারন উদ্যোক্তারা অনেকেই মানসিক চাপ নিয়ে তার উদ্যোগ কে সফলার দিকে নিয়ে যেতে পারে

বাড়ির ছাদে ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী রায়হান!

‘পরিবারে কোনো আর্থিক অনটন ছিল না। পড়েছি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাই আমার মতো ছেলে কেন ছাগল পালন করবে, এটাই ছিল মানুষের আপত্তির কারণ। কিন্তু মানুষের সেসব